চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে। কিন্তু তাদের নতুন শুল্ক নীতি বহুপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনার ভারসাম্যকে উপেক্ষা করছে। চীন এর তীব্র বিরোধিতা করছে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।”
চীনের পণ্যে ৫৪ শতাংশ শুল্ক, ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের নতুন ধাপ
ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল বুধবার (২ এপ্রিল) ঘোষণা করেছেন, চীনা পণ্যের ওপর ৩৪ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করা হবে, যা চলতি বছরে আগের ২০ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে মিলিয়ে মোট ৫৪ শতাংশ হবে। ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারের সময় যে ৬০ শতাংশ শুল্কের হুমকি তিনি দিয়েছিলেন, তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে নতুন শুল্ক হার।
এই নতুন শুল্ক ব্যবস্থা ৬ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে, যেখানে প্রাথমিকভাবে ১০ শতাংশ সাধারণ শুল্ক আরোপ করা হবে, এরপর ৯ এপ্রিল থেকে বাকি ২৪ শতাংশ ‘প্রতিশোধমূলক শুল্ক’ কার্যকর হবে।
এ ছাড়া, ট্রাম্প একটি নতুন নির্বাহী আদেশে “ডি মিনিমিস” শুল্ক ছাড় বন্ধ করে দিয়েছেন, যার ফলে চীন ও হংকং থেকে কম মূল্যের পণ্য শুল্ক মুক্তভাবে মার্কিন বাজারে প্রবেশ করতে পারবে না।
২০২০ সালের বাণিজ্য চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ
ট্রাম্প প্রশাসন চীনের বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ‘ফেজ ওয়ান’ বাণিজ্য চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। ওই চুক্তি অনুযায়ী, চীন দুই বছরে ২০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বেইজিং সেই লক্ষ্য পূরণ করতে ব্যর্থ হয়।
২০১৭ সালে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৫৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করত, যা গত বছর বেড়ে ১৬৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

বিশ্বব্যাপী শুল্ক ও সরবরাহ শৃঙ্খলের ধাক্কা
ট্রাম্পের বিশ্বব্যাপী শুল্ক আরোপ কৌশল সবচেয়ে বেশি চীনের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীনা কোম্পানিগুলো ভিয়েতনাম ও মেক্সিকোর মতো দেশগুলোর মাধ্যমে পণ্য রপ্তানির বিকল্প পথ খুঁজে নিয়েছিল। কিন্তু এবার ট্রাম্প ভারত, মেক্সিকো, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোর ওপরও ২৪ শতাংশ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসিয়েছেন, যা চীনা কোম্পানির জন্য বিকল্প বাণিজ্য পথকেও কঠিন করে তুলবে।

চীনের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
চীন ইতোমধ্যে অতিরিক্ত সরকারি বিনিয়োগ, ঋণ সুবিধা বৃদ্ধি, মুদ্রানীতি শিথিলকরণ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, যাতে ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের প্রভাব কমানো যায়।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ট্রাম্প জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বৈঠকে বসতে পারেন, যা বাণিজ্য সংকট সমাধানের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসিজের সিনিয়র ফেলো ক্রেগ সিংলেটন বলেন, ‘ট্রাম্প ও শি চাপ ও মর্যাদার দ্বন্দ্বে আটকে গেছেন। কেউই প্রথমে পিছু হটতে চায় না, তবে আলোচনার দীর্ঘসূত্রতা সংকট আরও বাড়াতে পারে।’
বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলে এই নতুন শুল্ক নীতি বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, যা বাণিজ্য, উৎপাদন ও বিনিয়োগের ওপর দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে।